সংবাদের বিস্তারিত

নারী উদ্যোক্তাদের নবযাত্রা: ক্ষুদ্র ঋণ থেকে জাতীয় অর্থনীতির চালিকাশক্তি

সংবাদে ফিরে যান
নারী উদ্যোক্তাদের নবযাত্রা: ক্ষুদ্র ঋণ থেকে জাতীয় অর্থনীতির চালিকাশক্তি

নারী উদ্যোক্তাদের নবযাত্রা: ক্ষুদ্র ঋণ থেকে জাতীয় অর্থনীতির চালিকাশক্তি

এক দশক আগেও বাংলাদেশের নারী উদ্যোক্তাদের গল্প ভিন্ন ছিল। অধিকাংশ নারী সীমিত পরিসরে ক্ষুদ্র ঋণের মাধ্যমে ঘরোয়াভাবে ব্যবসা করতেন। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোয় অর্থনীতির প্রেক্ষাপট দ্রুত বদলাচ্ছে। মাইক্রোফাইন্যান্সকে ছাড়িয়ে নারীরা এখন ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের দিকে এগোচ্ছেন। বিশ্বব্যাংক ও আইএফসি’র তথ্য বলছে, বর্তমানে বাংলাদেশের ফরমাল সেক্টরে নারী মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা খুব বেশি না হলেও, প্রবণতা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

জাতীয় পর্যায়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, নারী-পুরুষের মধ্যে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির পার্থক্য দৃশ্যমান। ২০২২ সালের হাউজহোল্ড ইনকাম অ্যান্ড এক্সপেন্ডিচার জরিপ অনুযায়ী, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থাকা নারীদের হার ২২ শতাংশের মতো, যেখানে পুরুষের হার ৩৪ শতাংশের বেশি। অর্থাৎ অধিকাংশ নারী উদ্যোক্তা এখনো ফরমাল ফাইনান্সিয়াল সার্ভিসে প্রবেশ করতে পারেননি। ফলে ব্যবসার প্রসার সীমিত থাকছে এবং বাজারে টিকে থাকা তাদের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

এ বাস্তবতায় নারী-কেন্দ্রিক উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট। দেশের কিছু আর্থিক প্রতিষ্ঠান গত কয়েক বছরে নারীদের জন্য বিশেষায়িত কিছু প্রোগ্রাম চালু করেছে। যেমন আইপিডিসি ফাইন্যান্স পিএলসি ২০১৮ সালে নারীদের জন্য একটি উদ্যোগ নেয়, যা পরবর্তীতে ‘জয়ী ৩৬০’ প্রোগ্রাম হিসেবে পরিচিতি পায়। এটি মূলত নারীদের ব্যবসার উন্নয়নের লক্ষ্যে চালু করা হলেও কেবল ঋণ প্রদানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। অ্যাক্সেস টু ফাইন্যান্স, অ্যাক্সেস টু ক্যাপাসিটি ডেভেলপমেন্ট, অ্যাক্সেস টু বিজনেস সাপোর্ট এবং অ্যাক্সেস টু মার্কেট – এ চার এর সমন্বয়ে ‘জয়ী ৩৬০’ গঠিত। এর মাধ্যমে নারী উদ্যোক্তারা আলাদা একটি প্ল্যাটফর্ম পেয়েছে, যেখানে ঋণ সেবার পাশাপাশি প্রশিক্ষণ, নেটওয়ার্কিং ও বাজার সংযোগের সুযোগ ও ব্যবস্থা রয়েছে। ফলে অংশগ্রহণকারী উদ্যোক্তারা মূলধনের পাশাপাশি ব্যবসা বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও সহায়তা পেয়েছেন।

মহামারির সংকট অতিক্রম করে নারী উদ্যোক্তাদের ব্যবসা টিকিয়ে রাখা, বৃদ্ধি ও বাজারে প্রবেশ – সবকিছুতেই আইপিডিসি উল্লেখযোগ্য সহায়তা প্রদান করেছে। ২০২১-২২ সালে দেশে নারী উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ ছিল মাত্র ৬–৮ শতাংশ। সে সময় প্রায় ৪১ শতাংশ নারী-নেতৃত্বাধীন ব্যবসা বন্ধ হয়ে যায়। তবে ধীরে ধীরে পরিস্থিতি বদলে বর্তমানে দেশে প্রায় ২.৮ মিলিয়ন, অর্থাৎ মোট এসএমই উদ্যোগের ২৫ শতাংশের নেতৃত্ব দিচ্ছে নারীরা। যদিও রেজিস্টার্ড প্রতিষ্ঠানে তাদের মালিকানা এখনো ৭.২ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ। এ ছাড়া জয়ী’র গ্রাহকসংখ্যা ১১৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং প্রান্তিক জয়ী পোর্টফোলিও আগের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। আইপিডিসি’র নারী উদ্যোক্তা পোর্টফোলিও’র বার্ষিক বৃদ্ধির হার ২০২২–২৩ সালে ছিল ১৩.৫ শতাংশ, যা ২০২৩–২৪ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৫.৮ শতাংশ। একই সময়ে নারী উদ্যোক্তাদের সংখ্যা ২৪.৮ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ২৮ শতাংশ।

এ ছাড়া বাংলাদেশ উইমেন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (বিডব্লিউসিসিআই) নারী উদ্যোক্তাদের জন্য একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছে, যা তাদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে সহায়তা করছে। ‘শান্তিবাড়ি’ নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিভিন্ন প্রদর্শনী, মেলা ও প্যানেল আলোচনাসহ বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে, যা নারী উদ্যোক্তাদের ব্যবসায়িক দক্ষতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করছে। ‘শক্তি ফাউন্ডেশন’ নারী উদ্যোক্তাদের ক্ষুদ্রঋণ, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক উন্নয়নের মাধ্যমে সহায়তা প্রদান করছে। এসব প্রতিষ্ঠান ও প্ল্যাটফর্মগুলো প্রশিক্ষণ, নেটওয়ার্কিং, বাজার সংযোগ ও আর্থিক সহায়তার সুযোগ-সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে নারী উদ্যোক্তাদের ব্যবসায়িক সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে ভূমিকা রাখছে। এছাড়া, আইপিডিসি’র মিরপুর শাখায় উদ্যোক্তাদের বিভিন্ন পরামর্শ-ভিত্তিক সেবা দিচ্ছে ‘জয়ী সখী ডেস্ক’। তবে এরপরও কি তা যথেষ্ট?

বিশ্বব্যাংক এবং উইমেন এন্ট্রাপ্রেনিওরস ফাইন্যান্স ইনিশিয়েটিভ বা উই-ফাই-এর একটি গবেষণা মতে, বাংলাদেশে নারী-উদ্যোক্তাদের জন্য অর্থায়নের বড় একটি ঘাটতি রয়ে গেছে। জামানত দেয়ার মতো সম্পদ না থাকায় তারা প্রচলিত ব্যাংক ঋণে পিছিয়ে পড়েন। সেক্ষেত্রে অনেকের জন্য ডিজিটাল ফাইন্যান্স ও স্কিল ডেভেলপমেন্টই হতে পারে নতুন সম্ভাবনার দরজা।

তবে নারী উদ্যোক্তা উন্নয়নের চিত্র সারা দেশে সমান নয়। রাজধানী ও বড় শহরগুলোতে নারী-নেতৃত্বাধীন ব্যবসার সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পেলেও, গ্রামীণ অঞ্চলে তা এখনো সীমিত। অনেক নারীই কেবল হস্তশিল্প, খাদ্য-প্রস্তুত, পশু পালন বা ছোট দোকান পরিচালনাতেই সীমাবদ্ধ থাকেন। বাজারে প্রবেশের সুযোগ, সাপ্লাই চেইন ও লজিস্টিক সহায়তা না পাওয়া ও এসব বিষয়ে যথাযথ জ্ঞান না থাকায় তাদের ব্যবসাগুলো খুব একটা বড় হতে পারে না। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য মতে, অধিকাংশ নারী উদ্যোক্তা এখনো অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতেই সীমাবদ্ধ, যা তাদের ব্যবসাকে অচিহ্নিত ও দুর্বল করে রাখে।

এত কিছুর পরও আশার আলো প্রবল। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নারী উদ্যোক্তা নেটওয়ার্ক, ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম এবং ট্রেনিং ইনিশিয়েটিভ বৃদ্ধি পাচ্ছে। সরকারি নীতিতেও নারী উদ্যোক্তাদের জন্য কর রেয়াত, এসএমই ঋণ এবং ডিজিটাল দক্ষতা উন্নয়নকে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে ক্ষুদ্র ঋণগ্রহীতা থেকে শুরু করে মার্কেট লিডারশীপে পৌঁছানো নারীর সংখ্যা আরো বাড়বে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নারী উদ্যোক্তাদের সমর্থন দেয়া মানে শুধু অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি নয়, বরং পরিবার ও সমাজের সার্বিক উন্নয়ন। কারণ একজন নারী ব্যবসায়ী যখন শক্তিশালী হন, তার সঙ্গে পুরো পরিবারের জীবনমানও উন্নত হয়।

তবু সামগ্রিক চ্যালেঞ্জ অস্বীকার করা যায় না। প্রাতিষ্ঠানিক খাতে নারী উদ্যোক্তাদের মালিকানা এখনো সীমিত, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ব্যবহারকারী হিসেবে পার্থক্য লক্ষ্যনীয়, এবং বাজার প্রবেশাধিকারেও লিঙ্গবৈষম্য দেখা যায়। এসব পরিসংখ্যান প্রমাণ করে, শুধু মূলধন নয়, বরং দক্ষতা, বাজার সংযোগ ও নীতিগত সহায়তাও সমান জরুরি।

নারী উদ্যোক্তাদের নেতৃত্ব, দক্ষতা এবং সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতি কেবল শক্তিশালী নয়, হয়ে উঠবে আরো টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক। বাজারের মূল ধারায় সাফল্য অর্জনে যে নারীরা প্রস্তুত, তা এরই মধ্যে স্পষ্ট। সঠিক নীতি, প্রশিক্ষণ ও সমর্থনের মাধ্যমে এ যাত্রা আরো সহজ হবে এবং শেষ পর্যন্ত এটি দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্রোতকে নতুন গতি দেবে।

News Link: Click Here

সকল ফর্ম
গ্রাহক নিবন্ধন
A2GF